কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ইট যেন ঘুস খায়! এখানে ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না। অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছেন বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদ। দুর্নীতি করে হাজার কোটির মালিক হয়েছেন এই সরকারি কর্মকর্তা। গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গেও ছিল তার বিশেষ সখ্য। তাকে ব্যবহার করে এবং মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তিনি কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে বদলি হন। আগের কর্মস্থলগুলোতেও দুর্নীতিবাজ ও ঘুসখোর হিসেবে পরিচিত ছিলেন ইমরুল।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বদলি হয়ে কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে আসার পর থেকে সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদ দলিল জালিয়াতি, ঘুস গ্রহণ, রাজস্ব ফাঁকি, ভুয়া দাতা দেখিয়ে দলিল নিবন্ধনসহ নানা অনিয়ম করেই চলেছেন। তার দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণাদি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে বড় অঙ্কের টেবিল মানি ছাড়া ফাইল নড়ে না। এছাড়া অফিসের নকল নবিস মো. ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেলের মাধ্যমে কাজ না করলে সাধারণ গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় দলিল লেখকদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। সরকারি ওমেদারদের বাদ দিয়ে নিজেরাই কমিশন ভিত্তিক রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেন। কমিশন রেজিস্ট্রির জন্য দাতার বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দলিল নিবন্ধন না করে ফিরে আসেন। আবার বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে ভুয়া দাতার টিপসই বসিয়ে কমিশন দলিল নিবন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।
একই অভিযোগে বলা হয়েছে, মেহেদী হাসান রুমেল বিগত দিনে নিজেকে ঢাকা জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সহযোগিতায় রেজিস্ট্রিকৃত দলিল আলমারি থেকে বের করে ইচ্ছামতো নাম ও তফসিল পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানেও সেই প্রভাব বজায় রেখেছেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভুয়া দাতা সাজিয়ে জাল দলিল তৈরি, সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি এবং পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন আড়াকুল মৌজার ০৪৫০ অযুতাংশ জমির (১২ মার্চ, ২০২৫) ২৩০৪ নম্বর বায়নানামা দলিল নিবন্ধিত হয়। দলিলটির মূল্য ছিল ৪৬ লাখ টাকা এবং বায়না বাবদ ৮ লাখ টাকা উল্লেখ ছিল। গ্রহীতা ছিলেন মো. সোনা মিয়া হাওলাদার এবং দাতা মো. বদরুল আলম লাবুর পক্ষে ছিলেন আবুল হাসনাত মিন্টু। ওই দলিলের ভিডিও ও ফটোকপি সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়, পরে এক লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নকল নবিস ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেল মূল বায়না দলিলের মূল্য সংক্রান্ত পৃষ্ঠা পরিবর্তন করে কম মূল্য দেখিয়ে দলিলটি সংরক্ষণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট তারিখে ৮১৩৫ নম্বর সাফ কবলা দলিল নিবন্ধনের সময় বায়না গ্রহীতা সোনা মিয়ার নাম বাদ দিয়ে তার ছেলে মো. আল আমিন হাওলাদারের নামে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের দলিল নিবন্ধন করা হয়। সাফ কবলা নিবন্ধনের দিন বায়না দলিলের সার্টিফায়েড কপি ও মূল রসিদ নকল নবিস ফারুক নিজের হেফাজতে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
আরেকটি ঘটনায় অভিযোগ করা হয়েছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন বেয়ারা মৌজার ৩৭৬৪ অযুতাংশ জমির (২৪ নভেম্বর, ২০২৫) ১২০১০ নম্বর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল নিবন্ধন করা হয়। ওই সম্পত্তির নামজারি ও খাজনার কাগজপত্র ভুয়া দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে দলিল নিবন্ধনে আপত্তি জানালেও পরে নকল নবিস ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেলের পরামর্শে সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদ পাঁচ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণ করে দলিল নিবন্ধন করেন। একই সঙ্গে অফিস খরচের নামে ফারুক ও রুমেল আরও এক লাখ টাকা নেন। ভুয়া নামজারি ও খাজনার রসিদের ফটোকপিও তারাই সংগ্রহ করে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মো. শাকিল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি জানান, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন বাঘৈর মৌজার ৩৬১ শতাংশ জমি (৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ ও ৩ মার্চ ২০২৫) কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব রেজিস্টার অফিসে রেজিস্টিকৃত ৩১৯৭৯ ও ১৯২২ নম্বর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল নিবন্ধন হয়েছে। ওই দলিলে দাতা ছিলেন অঞ্জন সেনগুপ্ত ও সঞ্জয় সেনগুপ্ত এবং গ্রহীতা ছিলেন আল আমিন মিনা।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি গ্রহীতাকে কোনো রকম নোটিশ ছাড়াই দলিলটি বাতিল করা হয়। এ জন্য সাব-রেজিস্ট্রার নগদ ১০ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণ করেন এবং অফিস খরচের নামে নকল নবিস ফারুক ও মেহেদী হাসান রুমেল আরও দুই লাখ টাকা নেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, দলিল বাতিলের আগেই পাওয়ার দাতারা আল আমিন মিনার কাছ থেকে হাতবায়না হিসেবে এক কোটি ২০ লাখ টাকা প্রদান করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তিনি রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি কিনেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এছাড়া শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মাহমুদ মুন্সির কান্দি এলাকায় নিজের নামে, বাবা মোহাম্মদ আর্শেদ আলী ও মা আইরিন পারভীনের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন এই সরকারি কর্মকর্তা।
আরও জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে যোগদানের আগে তিনি মৌলভীবাজার সদর, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন ও সদরপুর, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, ঢাকা উত্তরার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসব জায়গাতেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তিনি কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে বদলি হন। তৎকালীন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং সাবেক কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং তার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান রয়েছে ।
দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইমরুল খোরশেদের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
0 Comments